চাকরি ছাড়ছেন কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর স্বাস্থ্যকর্মীরা

কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর স্বাস্থ্য কর্মীদের চাকরি জাতীয়করণ হবে এমন সিদ্ধান্তের ৩ বছর পেরিয়ে গেলে এখনও শুরু হয়নি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। চাকরির বয়স ৫ বছরে হয়ে গেলেও মাঠ পর্যায়ের এই স্বাস্থ্য কর্মীরা পাননি কোনো ইনক্রিমেন্ট। মাসিক বেতনটাও নিয়মিত হয় না। এমনকি ছুটি পর্যন্ত পান না তারা। তাই হতাশাকবলিত এসব স্বাস্থ্য কর্মী বা কমিউনিটি ক্লিনিক হেলথ কেয়ার প্রভাইডারদের (সিএইচসিপি) অনেকে বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। এ কারণে অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম।
জানা গেছে, চাকরি জাতীয়করণ না হওয়াসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে ইতিমধ্যে চারশ’র মতো স্বাস্থ্য কর্মী চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকে ছাড়ার পথে। অবিলম্বে কর্মরত স্বাস্থ্য কর্মীদের চাকরি জাতীয়করণ না হলে ভবনসর্বস্ব হয়ে পড়তে পারে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো।
কমিউনিটি ক্লিনিক হেলথ কেয়ার প্রভাইডার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. নাঈম উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, প্রতিশ্রুতির তিন বছর পেরিয়ে গেলেও চাকরি জাতীয়করণের কোনো প্রক্রিয়া এখনও শুরু হয়নি। ২০১১ সালে কাজে যোগদানের পর থেকে এখনও কোনো ইনক্রিমেন্ট পাননি কর্মরত সিএইচসিপিরা। বেতনও অনিয়মিত। এসব বিষয় নিয়ে চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সঙ্গে আলোচনা হয়। এ সময় স্বাস্থ্য সচিব এবং প্রকল্প পরিচালকও উপস্থিত ছিলেন। তারা জানান, চাকরি জাতীয়করণের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর এক্তিয়ার। তবে ইনক্রিমেন্টের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। চার মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও কিছুই হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সাল থেকে চাকরি জাতীয়করণের আলোচনা শুরু হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ২৪ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব সালমা ছিদ্দিকা মাহাতাব, একই বছরের ২৯ জুলাই প্রকল্প পরিচালক ডা. মাখদুমা নার্গিস এবং ১৯ সেপ্টেম্বর তারিখে স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. শাহনেওয়াজ সিভিল সার্জনদের চিঠির মাধ্যমে চাকরি জাতীয়করণের বিষয়টি জানান। ২০১৪ সালের ১৪ এপ্রিল তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক ডা. মাখদুমা নার্গিস দেশের সব সিভিল সার্জনদের সিএইচসিপিদের চাকরি বই খোলার বিষয়ে চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি বলেন, ‘রিভাইটালাইজেশন অব কমিউনিটি হেলথ কেয়ার ইনিশিয়েটিভস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় কর্মরত সিএইচসিপিদের চাকরি বই খুলে তাদের যোগদানের তারিখ ও নৈমিত্তিক ছুটি ব্যতীত সব ধরনের ছুটি মঞ্জুরির আদেশ অনুযায়ী চাকরি বইতে লিপিবদ্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করার অনুরোধ করা হল।
জানা যায়, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দিতে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্প চালু করে সরকার। ইতিমধ্যে সারা দেশের ক্লিনিকগুলোতে প্রায় সত্তর কোটিবার ভিজিটের মাধ্যমে জনগণ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করেছেন। মহিলা সিএইচসিপিরা সিএসবিএ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে প্রায় আড়াই হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের নরমাল ডেলিভারি সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত সিএইচসিপিরা জানান, আইএমডি’র মূল্যায়ন প্রতিবেদন-২০১৩ প্রকল্প অফিস থেকে বলা হয়েছিল ২০১৫ সালের জুলাই মাসে চাকরি জাতীয়করণ করা হবে। এমনকি চাকরি রাজস্বকরণ হবে বলে সারা দেশের সিএইচসিপিদের নামে সার্ভিস বুক ও এসিআর ফরম খোলা হয়। কিন্তু তারপর এই প্রক্রিয়া থমকে যায়। এ কারণে ইতিমধ্যে প্রায় চারশ’র মতো সিএইচসিপি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। প্রতি দিনই দু’একজন চাকরি ছাড়ছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ শতাংশ সিএইচসিপির সরকারি চাকরির বয়স শেষ হয়ে গেছে। সিএইচসিপিদের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার হাজার মুক্তিযোদ্ধার সন্তান রয়েছে। এরা প্রত্যেকেই হতাশায় ভুগছেন। তারা আরও জানান, সিএইচসিপি পদে কর্মরতদের নিয়োগ বিধিতে কোনো ছুটি নেই। ফলে কেউ যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন, বা দুর্ঘটনা কবলিত হয়ে অনুপস্থিত থাকেন তাহলে তাদের বেতন কাটা যায়। এভাবে চলতে থাকলে স্বল্প সময়ে সিএইচসিপিদের বড় অংশ চাকরি ছেড়ে দেবে। ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছানো অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
জানতে চাইলে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্পের বর্তমান প্রকল্প পরিচালক ডা. মমতাজুল হক যুগান্তরকে বলেন, একবারে চাকরি জাতীয়করণ সম্ভব নয়। এটি ধাপে ধাপে করতে হবে। সেই প্রক্রিয়া চলছে। ২৯ আগস্ট স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সুপারিশসহ এসংক্রান্ত চিঠি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সেখানে তাদের ছুটি নিশ্চিতকরণ, নির্ধারিত গ্রেডে আনুষঙ্গিকসহ বেতন প্রদানের সুপারিশ করা হয়েছে। অনিয়মিত বেতন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রকল্পের চাকরি হওয়ায় ওপি থেকে তাদের বেতন দেয়া হয়। তাই সেটা নিয়মিত দেয়া সম্ভব হয় না।
প্রসঙ্গত, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর ১৯৯৮ সালে ছয় হাজার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে সরকার পরিবর্তন হলে তৎকালীন সরকার ২০০১ সালে প্রকল্পটির কর্যক্রম বন্ধ করে দেয়। জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দেয়ার অঙ্গীকার নিয়ে ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্প পুনরায় চালু করে। ২০১১ সালে কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য হেলথ কেয়ার প্রভাইডার হিসেবে ১৩ হাজার ৫০০ জনবল নিয়োগ দেয়া হয়।
সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ